ডায়াবেটিসে পায়ের ঝুঁকি কেন বেশি
দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসে পায়ের ছোট রক্তনালী ও স্নায়ু দুটোই ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রক্ত চলাচল কমে যাওয়ার কারণে পায়ে কোনো ছোট আঘাত বা ঘা হলে তা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দেরিতে সারে। একইসাথে স্নায়ুর সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে অনেক রোগী পায়ে ছোট আঘাত, ফোসকা বা কাটা টের পান না, ফলে সমস্যাটা অনেক দিন অগোচরে থেকে যায়। এই দুটো কারণ একসাথে মিলে ডায়াবেটিক ফুটকে এমন একটা অবস্থায় পরিণত করে, যেখানে একটা সাধারণ ঘা-ও সময়মতো নজরে না এলে গুরুতর রূপ নিতে পারে। এজন্যই ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের প্রতিদিনের যত্ন নিছক অভ্যাস নয়, বরং একটা প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা।
প্রতিদিনের যে অভ্যাসগুলো পা সুরক্ষিত রাখে
নিচের অভ্যাসগুলো প্রতিদিন মেনে চললে ডায়াবেটিক ফুটের বড় জটিলতা এড়ানো সহজ হয়ে যায়।
- প্রতিদিন পা পরীক্ষা করুন — ভালো আলোয় পায়ের তলা, আঙুলের ফাঁক ও গোড়ালি খুঁটিয়ে দেখুন। প্রয়োজনে আয়না ব্যবহার করুন বা পরিবারের কারো সাহায্য নিন।
- পা প্রতিদিন ধুয়ে শুকনো রাখুন — হালকা গরম পানিতে (গরম পানি দিয়ে নয়, কারণ সংবেদনশীলতা কম থাকলে পুড়ে যাওয়াও টের পাওয়া যায় না) পা ধুয়ে নরম তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে, বিশেষত আঙুলের ফাঁক শুকিয়ে নিন।
- নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন — শুষ্ক ত্বকে ফাটল ধরে সহজেই ইনফেকশনের পথ তৈরি হয়। তবে আঙুলের ফাঁকে ক্রিম না লাগানোই ভালো, কারণ সেখানে অতিরিক্ত ভেজা ভাব ফাঙ্গাল ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ায়।
- নখ সাবধানে কাটুন — নখ সোজা করে কাটুন, খুব ছোট করে বা কোণাগুলো গভীরভাবে কাটবেন না, এতে ইনগ্রোন নখ ও ইনফেকশনের ঝুঁকি কমে।
- সবসময় জুতা ও মোজা পরুন — খালি পায়ে হাঁটা এড়িয়ে চলুন, এমনকি ঘরের ভেতরেও। ছোট একটা কাঁটা বা কাচের টুকরো, যা সংবেদনশীলতা কম থাকায় টের পাওয়া যায় না, বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
- সঠিক মাপের আরামদায়ক জুতা বাছাই করুন — খুব টাইট বা ঘষা লাগে এমন জুতা পরিহার করুন। নতুন জুতা প্রথমে অল্প সময়ের জন্য পরে দেখুন কোথাও ঘষা লাগছে কিনা।
- রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন — রক্তে শর্করার মাত্রা যত ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে, ক্ষত সারার গতি ও স্নায়ুর কার্যক্ষমতা তত ভালো থাকে।
যেসব প্রাথমিক লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়
পা অসাড় লাগা, ঝিনঝিন করা বা জ্বালাপোড়া অনুভূতি, ছোট কোনো ঘা বা ফোসকা যা কয়েক দিনেও শুকাচ্ছে না, আঙুলের রং কালচে বা নীলচে হয়ে যাওয়া, পায়ে ঠান্ডা অনুভূতি, অথবা পায়ের কোনো অংশে ফোলাভাব ও লালচে ভাব — এই লক্ষণগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সহজেই ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। সমস্যা হলো, অনেক রোগীই স্নায়ুর সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে এই পরিবর্তনগুলো নিজে থেকে টের পান না, তাই পরিবারের কারো সাহায্যে নিয়মিত পা পর্যবেক্ষণ করাটা জরুরি হয়ে ওঠে।
কখন সাথে সাথে ডাক্তার দেখাবেন
পায়ে কোনো ঘা তিন-চার দিনের বেশি সময় ধরে না শুকালে, ঘা থেকে দুর্গন্ধ বা পুঁজ বের হলে, আঙুল বা পায়ের কোনো অংশ কালো হয়ে যেতে শুরু করলে, অথবা হঠাৎ জ্বর সহ পা ফুলে গেলে দেরি না করে সরাসরি ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। এই পরিস্থিতিতে ঘরোয়া চিকিৎসা বা অপেক্ষা করার চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ ডায়াবেটিক ফুটে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ডাঃ আরীফ কীভাবে চিকিৎসা করেন
ডাঃ আরীফ প্রথমে পায়ের রক্ত চলাচল মূল্যায়ন করেন, কারণ ডায়াবেটিক ফুটের চিকিৎসায় শুধু ঘা সারানো নয়, বরং রক্ত চলাচল ঠিক করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি ক্ষত পরিচর্যা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং রক্তনালীর ব্লকেজ থাকলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন, যাতে সময়মতো হস্তক্ষেপের মাধ্যমে যতটা সম্ভব পা ও আঙুল রক্ষা করা যায়। প্রতিটি রোগীর অবস্থা আলাদা হওয়ায় চিকিৎসা পরিকল্পনাও ব্যক্তিভিত্তিক হয়।
পরিবারের সদস্যরা কীভাবে সাহায্য করতে পারেন
বয়স্ক ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে, বিশেষত যাদের দৃষ্টিশক্তি কম বা নিজে ঝুঁকে পা পরীক্ষা করা কঠিন, তাদের জন্য পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে অন্তত কয়েকবার পরিবারের কেউ পায়ের তলা, আঙুলের ফাঁক ও গোড়ালি খুঁটিয়ে দেখলে অনেক সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়েই ধরা পড়ে। জুতা কেনার সময় সাথে গিয়ে সঠিক মাপ ও আরামদায়ক জুতা বেছে নিতে সাহায্য করা, এবং নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষার সময়সূচি মনে করিয়ে দেওয়াও পায়ের সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে। এই ছোট ছোট সহায়তাই দীর্ঘমেয়াদে বড় জটিলতা এড়াতে সাহায্য করে।
কেন দেরি করা বিপজ্জনক
ডায়াবেটিক ফুটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটা প্রথম দিকে খুব সাধারণ মনে হয় — একটা ছোট ফোসকা বা সামান্য একটা কাটা, যা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কয়েকদিনেই সেরে যায়। কিন্তু কমে যাওয়া রক্ত চলাচল ও সংবেদনশীলতার কারণে ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে এই একই ধরনের ছোট ক্ষত দ্রুত সংক্রমিত হয়ে গভীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এবং চিকিৎসা না পেলে তা গ্যাংগ্রিনে রূপ নিতে পারে, যার ফলে পা বা আঙুল কেটে ফেলার প্রয়োজনও হতে পারে। তাই ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য "একটু অপেক্ষা করে দেখি" মনোভাবটা ঝুঁকিপূর্ণ — প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অঙ্গহানি এড়ানো সম্ভব।
জুতা ও মোজা নির্বাচনে আরও কিছু পরামর্শ
ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য সুতির নরম মোজা, যাতে সেলাই না থাকে বা সেলাই বাইরের দিকে থাকে, তুলনামূলক ভালো পছন্দ, কারণ ভেতরের দিকের সেলাই দীর্ঘ সময় ঘষা লেগে ত্বকে ক্ষত তৈরি করতে পারে। প্রতিদিন মোজা পরিবর্তন করা এবং ভেজা মোজা দীর্ঘক্ষণ না পরে থাকাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আর্দ্র পরিবেশ ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ায়। বিকেলের দিকে পা কিছুটা ফুলে যাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায়, জুতা কেনার সময় সকালের বদলে বিকেলে কেনাই ভালো, যাতে সারাদিন আরামদায়ক ফিট পাওয়া যায়।
বছরে অন্তত একবার পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা
প্রতিদিনের ঘরোয়া পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বছরে অন্তত একবার একজন ভাস্কুলার সার্জনের কাছে গিয়ে পায়ের রক্ত চলাচল ও স্নায়ুর সংবেদনশীলতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করানো উচিত, এমনকি কোনো সমস্যা চোখে না পড়লেও। এই পরীক্ষায় সাধারণত পায়ের নাড়ির স্পন্দন পরীক্ষা, প্রয়োজনে ডপলার স্টাডি এবং স্নায়ুর সংবেদনশীলতা যাচাই করা হয়। এই ধরনের নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে রক্ত চলাচল কমে যাওয়ার মতো পরিবর্তন উপসর্গ দেখা দেওয়ার অনেক আগেই ধরা পড়তে পারে, যা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করে।