বাংলাEN
ব্লগ

হাঁটলে পায়ে ব্যথা — কেন এটা শুধু "বয়স হয়েছে" বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়

পেরিফেরাল আর্টারিয়াল ডিজিজ (PAD) কী

পেরিফেরাল আর্টারিয়াল ডিজিজ, সংক্ষেপে PAD, হলো পায়ের ধমনীতে চর্বি জমে জমে ধীরে ধীরে সরু হয়ে যাওয়া, যার ফলে পায়ের মাংসপেশিতে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে বাধা তৈরি হয়। এটা মূলত হৃদরোগের মতোই একটা প্রক্রিয়া — শুধু হৃদপিণ্ডের বদলে সমস্যাটা পায়ের ধমনীতে ঘটে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ধমনীর দেয়ালে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ে, তাই PAD সাধারণত মধ্যবয়স বা এর পরের বয়সে বেশি দেখা যায়।

পায়ের মাংসপেশি হাঁটার সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রক্ত ও অক্সিজেন চায়। ধমনী সরু হয়ে গেলে বিশ্রামের সময় হয়তো পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ হয়, কিন্তু হাঁটা শুরু করলে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মাংসপেশি পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না — এবং তখনই ব্যথা শুরু হয়।

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ধূমপান — এই কারণগুলো PAD-এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়, কারণ এগুলো সবই ধমনীর দেয়ালে চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। যাদের একাধিক ঝুঁকির কারণ একসাথে আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা তুলনামূলক কম বয়সেও দেখা দিতে পারে, তাই শুধু বয়সের ওপর ভরসা করে "এখনো আমার বয়স হয়নি" ভাবাটাও ঠিক নয়।

ধমনী সরু হওয়ার প্রক্রিয়াটা সাধারণত বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে ঘটে, এবং শরীর প্রথম দিকে আশেপাশের ছোট রক্তনালীর মাধ্যমে কিছুটা ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করে। এই কারণেই লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই ধমনীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে — অর্থাৎ যখন প্রথম ব্যথা অনুভূত হয়, ততক্ষণে সমস্যাটা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল।

কেন একে "শুধু বয়স" বলে ভুল করা হয়

PAD-এর সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো কিছুদূর হাঁটার পর পায়ের মাংসপেশিতে টান ধরা, ভারী লাগা বা ব্যথা শুরু হওয়া, যা কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিলে আবার কমে যায় — চিকিৎসা পরিভাষায় একে ইন্টারমিটেন্ট ক্লডিকেশন বলা হয়। এই ধরনের ব্যথা প্রায়ই বার্ধক্যজনিত সাধারণ দুর্বলতা, বাত বা মাংসপেশির ক্লান্তির সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়, কারণ দুটোই একইভাবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেখা দেয়।

কিন্তু আসল পার্থক্য হলো ধরন ও ছন্দে — সাধারণ বার্ধক্যজনিত ক্লান্তি একটানা থাকে এবং ধীরে ধীরে কমে, অন্যদিকে PAD-এর ব্যথা একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব হাঁটার পরই শুরু হয় এবং থামলে দ্রুত কমে যায়, আবার হাঁটলে আবার শুরু হয় — এই "হাঁটলে ব্যথা, থামলে আরাম" প্যাটার্নটাই PAD-এর সবচেয়ে বড় সংকেত। দুর্ভাগ্যবশত এই প্যাটার্নটা প্রায়ই লক্ষ্য করা হয় না, কারণ মানুষ ভাবেন এটা শুধু বয়সজনিত স্বাভাবিক ব্যাপার।

আরেকটা কারণেও এই ব্যথা অবহেলিত থেকে যায় — অনেকেই ধরে নেন যে বয়স বাড়লে হাঁটার গতি কমে যাওয়া, দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া স্বাভাবিক, তাই তারা নিজেরাই হাঁটার অভ্যাস কমিয়ে দেন এবং সমস্যাটা ধীরে ধীরে ব্যাখ্যাতীত হয়ে যায়। ফলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না, যদিও ভেতরে ভেতরে ধমনী ক্রমশ আরও সরু হয়ে চলেছে।

অবহেলা করলে কী হতে পারে

PAD অবহেলা করলে সময়ের সাথে সাথে যে দূরত্ব হাঁটলে ব্যথা শুরু হয়, তা ক্রমশ কমতে থাকে — অর্থাৎ আগে যেখানে দশ মিনিট হাঁটার পর ব্যথা হতো, কিছুদিন পর হয়তো পাঁচ মিনিটেই হতে শুরু করে। গুরুতর পর্যায়ে বিশ্রামের সময়ও ব্যথা হতে পারে, এমনকি পায়ে ছোট কোনো ঘা তৈরি হলে তা সহজে শুকাতে চায় না, কারণ ক্ষতস্থানে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে পারে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, PAD শুধু পায়ের সমস্যা নয় — এটা পুরো শরীরের রক্তনালীতে চর্বি জমার একটা সংকেত হতে পারে, যার মানে একই ধরনের ব্লকেজ হৃদপিণ্ড বা মস্তিষ্কের রক্তনালীতেও থাকতে পারে। তাই পায়ের ব্যথাকে হালকাভাবে নেওয়া মানে শুধু পায়ের ঝুঁকি না নেওয়া, বরং হৃদরোগ ও স্ট্রোকের সম্ভাব্য সতর্কতাকেও উপেক্ষা করা।

অনেক রোগী প্রথমদিকে হাঁটার পরিমাণ নিজে থেকেই কমিয়ে দেন, যাতে ব্যথা এড়ানো যায় — এটা স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যাটাকে আরও খারাপ করে, কারণ কম নড়াচড়া করলে রক্ত চলাচল আরও কমে যায় এবং মাংসপেশির সহনশীলতাও কমতে থাকে। এভাবেই ধীরে ধীরে একজন সক্রিয় মানুষ কয়েক বছরের মধ্যে চলাফেরায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারেন, অথচ পুরো সময়টায় তিনি ভেবেছেন এটা শুধু বয়সজনিত দুর্বলতা।

কখন ডাক্তার দেখাবেন

যদি আপনি লক্ষ্য করেন যে নির্দিষ্ট দূরত্ব হাঁটার পর নিয়মিতভাবে পায়ে ব্যথা বা টান ধরে এবং বিশ্রামে তা কমে যায়, বিশেষ করে যদি আপনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা ধূমপানের ইতিহাস থাকা কেউ হন, তাহলে এটা উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। এছাড়া পায়ের আঙুল ঠান্ডা লাগা, রং পরিবর্তন হওয়া, বা পায়ে কোনো ঘা যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে শুকাতে — এগুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এই মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে, শুধু আপনার অভিজ্ঞতাটা স্পষ্টভাবে লিখে রাখুন — কতদূর হাঁটলে ব্যথা শুরু হয়, কতক্ষণ বিশ্রামে তা কমে, এবং এই প্যাটার্ন কি সময়ের সাথে খারাপ হচ্ছে কিনা — এই তথ্যগুলো ডাক্তারের কাছে গেলে সঠিক নির্ণয়ে অনেক সাহায্য করে।

একটা বাস্তব কৌশল হলো, প্রতিদিন আনুমানিক কত মিনিট বা কত পা হাঁটার পর অস্বস্তি শুরু হয় তা মনে মনে লক্ষ্য রাখা। যদি দেখেন এই দূরত্ব সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে কমছে, তাহলে এটা একটা স্পষ্ট সংকেত যে সমস্যাটা অগ্রসর হচ্ছে এবং দ্রুত মূল্যায়ন প্রয়োজন। একইভাবে পায়ের ত্বকের রং, তাপমাত্রা বা নখের বৃদ্ধিতে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলে সেটাও ডাক্তারকে জানানো উচিত, কারণ এগুলো রক্ত চলাচলের অবস্থা সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য দিতে পারে।

ডাঃ আরীফ কীভাবে মূল্যায়ন ও চিকিৎসা করেন

ডাঃ আরীফ প্রথমে একটা বিস্তারিত ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজনে ডুপ্লেক্স স্ক্যানের মাধ্যমে পায়ের ধমনীতে ব্লকেজের অবস্থান ও তীব্রতা নির্ণয় করেন। হালকা পর্যায়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস, ঝুঁকির কারণ (যেমন ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ) নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব হয়।

গুরুতর ব্লকেজের ক্ষেত্রে এন্ডোভাস্কুলার পদ্ধতিতে (ছোট ছিদ্র দিয়ে) ব্লকেজ খুলে দেওয়া বা প্রয়োজনে সরাসরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রক্ত চলাচল পুনরুদ্ধার করা হয়। লক্ষ্য একটাই — সময়মতো চিকিৎসা করে সমস্যাকে অ্যাকিউট লিম্ব ইস্কিমিয়ার মতো জরুরি অবস্থায় পৌঁছাতে না দেওয়া।

চিকিৎসার ধরন যেটাই হোক, ডাঃ আরীফ প্রতিটা রোগীকে বোঝান কেন এই পদক্ষেপ প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতে একই সমস্যা যেন আবার ফিরে না আসে সেজন্য কী কী সতর্কতা নেওয়া দরকার। এভাবে শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার একটা পরিকল্পনাও তৈরি হয়।

শেষ কথা

হাঁটার সময় পায়ে ব্যথা হওয়া মানেই যে আপনার PAD আছে, তা এই লেখা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না — এটা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য। তবে "শুধু বয়স হয়েছে" ভেবে বছরের পর বছর এড়িয়ে যাওয়ার বদলে, একবার সঠিক পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ — এতে সময়ও লাগে কম, আর মনও শান্ত থাকে।

ডুপ্লেক্স স্ক্যানের মতো পরীক্ষা ব্যথাহীন ও সময়সাপেক্ষ নয়, অথচ এটা সরাসরি দেখিয়ে দেয় ধমনীতে ব্লকেজ আছে কিনা এবং থাকলে তা কতটা মারাত্মক। একবার এই তথ্য হাতে থাকলে ডাঃ আরীফ আপনার জন্য একটা স্পষ্ট, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দিতে পারবেন — সেটা হোক জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ওষুধ বা প্রয়োজনে প্রসিডিউর।

প্রশ্ন আছে?

জরুরি না রুটিন — সেটা নিশ্চিত হতে ডাঃ আরীফের সরাসরি পরীক্ষা করিয়ে নিন।

কল করুন